প্রচ্ছদ

কানাইঘাটের গোড়ামীতে : আমরা লজ্জিত

২৬ মে ২০১৯, ১৩:৩৩

অপরাধ বাণী

আব্দুল হালিম সাগর : কানাইঘাট উপজেলায় এক সময় কওমী মাদ্রাসার সংখ্যাটা ছিলো অনেক বেশী। স্কুল-কলেজের সংখ্যা ছিলো হাতেগুণা। প্রাথমিক বিদ্যালয় একটা থেকে আরেকটার দুরত্ব ছিলো ৫/৬ কিলোমিটার। হাইস্কুল কিংবা কলেজের লেখাপড়াকে বলা হতো নাস্তিকদের পড়া। কিছু কাঠমোল্লা সরাসরি ফতোয়া দিয়ে দিতো আধুনিক লেখাপড়াকে নিয়ে । তাই ছেলেদের স্কুলে পড়াতে তেমন একটা চাইতেন না বাবা-মা। প্রাইমারির গন্ডি পার হলেই শেষ। দু-একজন যদিও  সর্বচ্ছ শিক্ষার শিখরে পৌঁছেছেন। তারাই জানেন কত যাতনার কথা শুনতে হয়েছে তাদের। মেয়েদের কথা বাদ-ই দিলাম। এটা ছিলো মারাত্বক একটি অপরাধ। মেয়েরা কেন স্কুলে যাবে, তাদের শিক্ষার দরকার কি?  কারন মেয়ে হলে সর্বচ্ছ ক্লাশ ফাইভ পর্যন্ত আর মসজিদের মক্তবে কোরআন শরিফ খতম। এই শেষ তাদের শিক্ষার বিচরণ। বড় জোর দু-একজন হাইস্কুলে। কলেজে যাওয়া ছিলো অনেক বড় ধরনের অপরাধ। যদিও কোন মেয়ে কলেজে গেছে তো তার বাবা-মাকে কত কথা শুনতে হয়েছে। কিন্তু এখন আর সেই সময়টা নেই। শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেকটা এগিয়ে গেছে কানাইঘাট। তবে সেই আগেকার অনেকটা গোড়ামী রয়েছে এখনও বিভিন্ন এলাকার কিছু মানুষের মাঝে। ফলে প্রতি বছর রমজান মাস এলেই গ্রাম্যপূর্ব বিরুধগুলো কিংবা ছোটখাটো বিরুধ থেকে হয়ে থাকে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। খুন-রাহাজানী, মাদকসহ নানা রকম অপরাধের মাত্রটা বৃদ্ধি পায়। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে পুলিশ প্রশাসন নিজ-নিজ অবস্থান থেকে যথাসাধ্য চেষ্টা করেন পবিত্র এ মাসে যেনো এসব অপরাধগুলোকে ধমিয়ে রাখা যায়। যেহেতু এসব অপরাধ সমাজ থেকে তাদের পক্ষে নির্মূল করা সম্ভব নয়। হা এসব অপরাধ নির্মূল সম্ভব হতো, যদি আমাদের সামাজিক দায়িত্ববোধটা সঠিকমতো কাজ করতো। কারণ আমাদের অন্তরে কাজ করে হিংসা নামের একটি পশু। যা নিজের পাশাপাশি চারপাশের সমাজটাকেও কুড়ে কুড়ে খায়। বিশেষ করে পবিত্র রমজান হচ্ছে সিয়াম সাধনার মাস। কারণ রোজার মূল শিক্ষা হচ্ছে ত্যাগ-ধর্য্য পরীক্ষা। যাহা আল্লাহর কাছে খুবই পছন্দনীয়।

দেশের আলেম সমাজ বিভিন্ন সময় এসব নিয়ে বক্তব্য-সেমিনার-সিম্পোজিয়াম করে থাকেন। শুনান ধর্মের নানা রকম বাণী আর মনিষীদের জীবন থেকে নেওয়া শিক্ষা। কিন্তু আমরা এমন জাতি, একদিকে শুনি অপর দিকে তা বের করে দেই। মসজিদের ভিতরে এক কাতারে দাড়িয়ে সালাত আদায় করি, মুসলিম উম্মার শান্তি-সমৃদ্ধি কামনায় খোদার কাছে মোনাজাত করি, আবার মসজিদ থেকে বের হয়েই দুনিয়াবি ফিকিরের জন্য রক্তারক্তির মতো সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ি। ফলে ছিন্ন হচ্ছে আত্মীয়তার বন্ধন, সামাজিক অবকাঠামো আর বাড়িতেছে গোষ্টিগত বিরোধ। এটা কোন অবস্থায় কাম্য নয়। বিশেষ করে রমজান মাস এলেই জেলার কানাইঘাট উপজেলায় এরকম নানা অপরাধের মাত্রাটা বৃদ্ধি পায়। যাহার জন্য আমি নিজেই লজ্জিত। একদিকে যেমন ধর্মভীরু এলাকা, অপর দিকে তেমনি সামাজিক গোড়ামী নির্ভর এলাকা হয়ে উঠেছে কানাইঘাট উপজেলা। এ উপজেলায় যদিও আমার নিজের জন্মভূমি। কিন্তু সত্য বলতে লজ্জা নেই। আমার এলাকায় কিছু লেবাসধারী আছে মাথায় টুপি থাকে আর দাড়িয়ে যাত্রাগান দেখে, এমন নজির আমরা দেখে এসেছি ছোটকালে। আবার উপজেলাটা আলেম-উলামা সমৃদ্ধ এলাকা। দেশের সর্বত্র কানাইঘাট উপজেলা একটি ইসলাম প্রিয় এলাকা হিসাবে পরিচিত। এ উপজেলায় জন্ম নিয়েছেন অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি। তবে এখনো সামাজিক মূল্যবোধটি এলাকার মানুষের মধ্যে অনেকটা কম বলে আশপাশের উপজেলার বাসিন্ধারা প্রায়ই বলে থাকেন।

এই উপজেলার সন্তান হিসাবে গর্ববোধ করি কারি ইসলাম ধর্মের প্রতি এলাকার সহজ-সরল মানুষের রয়েছে গভীর শ্রদ্ধা আর দায়বদ্ধতা, এমনটাই আচঁ করতে পারা যায় বিভিন্ন ধর্মীয় নিয়নীতিতে। সম্প্রতি কয়েক বছর থেকে রমজান শুরু হলে উপজেলার কিছু মানুষ যেনো আরো হিংসাত্বক হয়ে উঠে। খুন-খরাবির মতো ঘটনার জন্ম দেয় বারবার। মসজিদে ঠিকমতো একই গ্রামের মানুষ একত্রে এক মসজিদে নামাজ পর্যন্ত পড়তে চায় না। তারাবির ইমাম নিয়োগ নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে মানুষ। মসজিদের হিসাব নিয়ে জড়িয়ে পড়ছে সংঘর্ষে, পরোকিয়ার জেরে স্ত্রী হত্যা করছে স্বামীকে, আবার স্ত্রীকে হত্যা করছে স্বামী, জমি নিয়ে বিরোধে ভাইকে ভাই হত্যা করছে ভাই। মাদক আর তীর নামের ডিজিটাল জুয়ার বিরচণ ক্ষেত্র যেনো বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিনিয়ত।

আজ থেকে কয়েক বছর আগেও এমন ছিলোনা উপজেলায়। ছিলো ভাতৃত্ব বন্ধন আর আত্মীয়তার দৃড় সম্পর্ক। গ্রাম্য-বিচার ব্যবস্থার উপর ছিলো সাধারণ মানুষের আস্তা-বিশ্বাস। বর্তমান সময়ের এসব সামাজিক অবক্ষয় থেকে মুক্তি পেতে যেমনি আমাদের নিজেদের রয়েছে দায়িত্ব-দায়বদ্ধতা, তেমনি উপজেলার প্রতিটি নাগরিকের প্রয়োজন সামাজিক সচেতনেতা। খুন-হত্যা, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে কোন বিরোধের সমাধান আসেনা বরং আলোচনা আর আইনের মাধ্যেমে এখনো অনেকটার সমাধান আসে সহজেই। তাই নিজ অবস্থান থেকে নিজের বিবেককে জাগ্রতো করতে পারলে অচিরেই কানাইঘাটের এসব দূর্ণাম আমরা ঘুছিয়ে নিতে পারবো বলে দৃড় বিশ্বাস করি।



এ প্রতিবেদনটি .475 বার পঠিতসংবাদটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন

0Shares