আড়ালে থাকা সিলেটের এক গিতিকারের নাম রহমত আলী রাসা

প্রকাশিত: ৩:০৭ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৫, ২০১৯

আড়ালে থাকা সিলেটের এক গিতিকারের নাম রহমত আলী রাসা

আব্দুল হালিম সাগর বিশেষ প্রতিবেদন : মানব জিবন একটি চলন্ত রেলগাড়ি, রংধনুর মতো মানব গাড়িটি বার-বার রং বদলায়। একটু খোলা মন নিয়ে চারপাশে থাকালে চোখে ধরা পড়ে কত রকমের বিচিত্র মানুষের কাজ কারবার। এদেশে যুগে যুগে জন্ম নিয়েছেন শত মুনিসী, দরবেশ, সাধক, গিতিকার, কবি-সাহিত্যিক। সকলেই বেঁচে আছেন তাদের নিজ কর্মগুণে। তারা প্রমান করে গেছেন মন থেকে চাইলে মানবজাতীকে অনেক মূল্যবান
কিছু উপহার দেওয়া সম্ভব। বিশেষ করে বৃহত্তর সিলেটের, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট জেলার বিভিন্ন উপজেলায় জন্ম নিয়েছেন, রাধারমন দত্ত, আরকুম শাহ, শিতালং শাহ, বাউল তসনা, মৌলভী ইয়াসিন, দেওয়ান হাসন রাজা, শাহ আব্দুল করিম, কফিল উদ্দিন সরকার, গিয়াস উদ্দিন সরকার, সৈয়দ শাহনুর, শেখ ভানু শাহসহ যাদের নাম লিখে শেষ করা যাবেনা। বিশেষ করে প্রচীন লোক কবি থেকে শুরু করে বর্তমান প্রজন্ম পর্যন্ত যেসব লেখক-গিতিকার তাদের লেখা পংক্তিমালাগুলোকে আমরা যদি কিঞ্চিৎ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি রেখা চিত্র আঁকতে চেষ্টা করি, তাহলে দেখা যাবে আধ্যাত্মিক সাধনার কেন্দ্রিয় মরকজ সুট্রাচীন সিলেটের ভূমির সুনাম ও সুখ্যাতি। মানব সভ্যতার আদিকাল থেকে এখন পর্যন্ত সিলেটের সূফী সাধক ও মরমি কবিদের হৃদয় উৎসারিত কালজয়ী পংক্তিমালা আমাদের মরমী সাতিত্যের উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে। মরমি সাধকগণ সর্বদা আত্মারটানে উন্মাদ হয়ে পড়েন। দেহের মধ্যে বিদ্যমান এই আত্মাকে নিয়ে মরমি কবিগণ রচনা করেন আধ্যাত্মবাদী কবিতা। যাহা আজ তাদের গান-কবিতায় আমরা উপলব্ধি করতে পারি। তেমনী একজন গান পাগল লেখক-গীতিকার, গবেষক সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার রহমত আলী (রাসা)। লেখাপড়ার গন্ডি তেমন একটা পাড়ি দিতে না পারলেও গান-ভাব আর ধ্যানের জগতে রয়েছে তার ব্যাপক বিচরণ। রয়েছে সিলেটের প্রচীনতম নাগরী ভাষায় যতেষ্ট জ্ঞান। বর্তমান প্রজন্মের লেখকরা প্রচারণায় অনেকটা এগিয়ে থাকলেও তিনি সব সময় আড়ালে থাকতেই পছন্দ করেন। নিজের পরিচিতি তোলে ধরতে রাজিনা আত্মীয় স্বজনের কাছে। গিতিকার রহমত আলী লেখা এ পর্যন্ত তিন শতাধিক গান গেয়েছেন দেশের নাম করা প্রথিতযশা শিল্পিরা। বাস্ত জীবনে তার নাম রহমত আলী হলেও গানের জগতে তিনি রাসা হিসাবে বেশ পরিচিত। তার লেখা গানের সংখ্যা প্রায় সহস্রাধীক ছাড়িয়ে গেছে। তিনি বিভিন্ন ধরণের গান লেখার পাশাপাশি বাউলগান নিয়ে গবেষণা করছেন দীর্ঘ দিন থেকে। এতো গানের রচয়িতা হলেও তিনি বরাবরই রয়ে গেছেন লোক চক্ষুর অন্তরালে। বর্তমান সময়ে সঠিক মুল্যায়ন আর যথাযোগ্য সম্মানটুকু যখন একজন গিতিকারকে দেওয়া হচ্ছেনা, সেই সময়ে সামনে এসে কিবা কি করার আছে, এমন মন্তব্য খোলামনের গিতিকার রহমত আলী (রাসা’র)। একজন শিল্পী যখন তার লেখা গানটি নিজের নামে চালিয়ে দেয়, সেখানে গিতিকারকে কেউ মূল্যয়ন করেনা, কিংবা ধিরে-ধিরে সেই গানের শ্রষ্টার নামটি হারিয়ে যায় কালেরগহব্বরে। সেই ধারণা থেকে আড়ালে চলে যাওয়া রহমত আলী রাসার। তিনি দীর্ঘ দুই যুগ ধরে নিরবে নির্ভৃতে গান লিখে যাচ্ছেন। সাদামনের মানুষটি শুধু গানই নয় নিজের কষ্ট্রার্জিত অর্থ ব্যয় করেন পথ শিশুদের জন্য। সিলেট নগরীর বিভিন্ন স্থানে শত-শত পথ শিশুদের নিয়ে কাজ করতে দেখা যায় তাকে। বাউল গিতিকার রহমত আলীর কথায় উঠে আসে প্রচার বিমুখ মানুষটির অনেক আক্ষেপ আর চাওয়া-পাওয়া আর না পাওয়ার গল্প। শুধু সুর আর সঙ্গীত দিয়ে তো গান হয় না, কথা লাগে। দুঃখজনক হলো, গিতিকারদের বর্তমানে সে ভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। একজন গীতিকারকে মানুষের মনোজগতের সবকিছুই উপলব্ধি করে সৃষ্টি করেন অমর সৃষ্টি। জনপ্রিয় গানটি জন্মলাভ করে গিতিকারের মেধা, শক্তি এবং দীপ্তিতে। মনের দৃশ্যপট থেকে প্রথমে ছন্দময় কবিতা,তারপর গিতিকারের হাত থেকে হয়ে সুরকারের হাতে। সুরকার সেই কথায় সুর সংযোজন করে তুলে দেন একজন কণ্ঠশিল্পীর কাছে। কণ্ঠশিল্পী গানটি পরিবেশন করার পর গানটা হয়ে যায় সেই শিল্পীর। আর গিতিকার রয়ে যান সব সময় আড়ালে। গিতিকার সাদা কাগজের উপর লিখেন কিছু ব্যক্তিমাখা শব্ধ গুচ্ছ, আর সুরকার সেই কথা গুলোকে সাত সুরে বাঁধেন আর গায়ক গায়িকা তাদের সুরলা কন্ঠে প্রাণ দেবার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রতিটি গান-কবিতা আর শব্দ গুচ্ছের পিছনে থাকে অনেক দু:খ সুখের কথা আর শব্দরাশি। যখন এসব গানের কথা নিয়ে কোন গিতিকারের কাছে যাওয়া হয় তখন মনে হয় প্রতিটি গানের পিছনে রয়েছে একটি অপ্রকাশিত গোপন গল্প। অনেকটা ঠাকুর ঘরের প্রতিমা তৈরীর মতো একটি জনপ্রিয় গানের জন্ম হয়ে থাকে। গতিকার রহমত আলী রাসার মূলবাড়ী গোলাপগঞ্জ উপজেলার তুড়–কভাগ গ্রামের। তার পিতার নাম মৃত আরব আলী। গিতিকার রহমত আলীর লেখা জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে, ভজন, বিরহ, ধামাইল, হামদ-নাত, আধুনিক, আঞ্চলিক, রক, দেহতত্ব, ভাব, আধ্যাত্মীক, ফোকসহ জীবনকর্ম নিয়ে নানা ধরনের গান। তার লেখা গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, জিবন গেল যৌবন গেল, যারে-যারে-যারে বুলবুল মদিনাতে যা,হাম তেরে ইস্কমে দিওয়ানা, আমি কান্দি-কান্দি রে রাত্র জাগিয়া আমি কান্দি, আমি ভালবাসি তুমায়, ধন্যবাদ-ধন্যবাদ জালাল বাবা ধন্যবাদ, সিলেটে জ্বালাইয়া ইসলামের মশাল,জাললে জালাল বাবা হকিকতের মাল, এইতো আছি আমি তোমাদের মাঝে, তর খতা মনে অইলে করি ছট ফটি, হাছা করি খওতো দেখি খত ভালা ফাছ,মরার আগে বন্ধু তোমায় একবার দেখতে চাই। ‘কইগেলে গো পাবো আমি প্রাণ বন্ধুর দরশন-কালা যাদু করিলো কালায়-ঘরে আর থাকেনা মন’,‘চৌদ্দ পুরুষ এর খুনি আসবে খুন করিতে-সেদিন পারবেনা কেউ তোমায় বাঁচাতে’।

সংবাদটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন
32Shares

দেশ বিদেশের সবগুলো অনলাইন পত্রিকার লিংক

বাংলাদেশের সকল টিভি চ্যানেল

ভিজিটর কাউন্টার

  • ৮৫১
  • ২৯২
  • ৩৫৬,২৬০